সানিন ! পেপসি খাবা?

সানিন ! পেপসি খাবা? ~

চট্টগ্রামের যে এলাকাতে এখন আছি, এখান থেকে সবচেয়ে কাছের বাজার হল ইয়াসিনের হাট। আসরের পর কিছু ওষুধ কেনার জন্য সেখানে গিয়েছিলাম। বাজারে পৌছতেই দেখা হল পরিচিত এক বড় ভাইয়ের সাথে। এ ভাইয়ের সাথে ঈদের দিনেও একটি ঘটনা ঘটেছিল। সেটাও আগে একদিন শেয়ার করেছিলাম।

যাই হোক, দেখা হতেই সালাম আদান প্রদান হল। এরপর তিনি অনেকটা জোর করেই একটি মিষ্টির দোকানে নিয়ে গেলেন। বারবার চাপাচাপি করছেন, কিছু খেতেই হবে। রাজি হওয়াতে তিনি মিষ্টির অর্ডার দিলেন। খাওয়ার শেষ পর্যায়ে তিনি বললেন,

- সানিন (আমার ডাক নাম) পেপসি খাবা? এখানে তো পেপসি ছাড়া আর কিছুই নেই। – একথা বলেই তিনি দুটি পেপসির অর্ডার দিলেন।

- ভাইয়া! আমি পেপসি খাব না। আমাকে বরং ঠাণ্ডা পানি দেন।

তিনি বুঝলেন আমি কেন খেতে চাচ্ছিনা। এতটুকু সম্মান অন্তত তখন তিনি করলেন, আমাকে আর জোর করলেন না। কিন্তু নিজের জন্য ঠিকই নিলেন।
দুই তিন মিনিট পার হওয়ার পর আমাকে জিজ্ঞেস করলেন,
-কেন খাবে না? ইহুদি প্রডাক্ট দেখে?
-জী

সাথে সাথে তিনি এত জোরে হেসে উঠলেন যেন আমি একটি মজার কৌতুক বলেছি।

-আরে বেকুব! তোমার মত এমন নিরামিষদের নিয়েই যত সমস্যা। আচ্ছা, তোমার কি মনে হয়? আমি তুমি পেপসি খাওয়া বন্ধ করে দিলেই কি ফিলিস্তিনে হামলা বন্ধ হয়ে যাবে? আরে আমি তুমি কেন, পুরো মুসলিম বিশ্বও যদি ইহুদি প্রডাক্ট বর্জন করে, তাহলেও কোন লাভ হবে না। ওদের এ কারণে যে আর্থিক ক্ষতি হবে, সেটা অন্য দিক দিয়ে ঠিকই ওরা পুষিয়ে নিবে। এই সব ফালতু আবেগ যত তাড়াতাড়ি বাদ দিবা, ততই ভাল।

-ভাইয়া! একটি কথা বলতে চাই। যদি আমাকে পুরোটা বলতে দেন আর মাইন্ড না করেন, তাহলে বলব।

অনুমতি পেয়ে বলতে শুরু করলাম,
-আপনার বাবাকে তো ওইদিন দেখতে গেলাম। আপনি বাসায় ছিলেন না তখন। অনেক বয়স হয়ে গিয়েছে, তাই না। আমরা যখন গিয়েছিলাম, ঘুমিয়ে ছিলেন তিনি। আচ্ছা ধরেন, আমি আপনার এই বৃদ্ধ বাবাকে একটি চাপাতি দিয়ে আধা ঘণ্টা যাবত কেবল কোপালাম। কোপাতে কোপাতে চালনী বানিয়ে এরপর থামলাম। তারপর......

শেষ করতে পারলাম না। প্রচণ্ড রাগ হয়ে গেলেন।
-তোমাকে তো ভদ্র ছেলে মনে করেছিলাম। এগুলো কি বলতেস?

এবার আমাকে একটু গরম হতেই হল।
-আমি অভদ্র, বেয়াদব, আরও অনেক কিছু। কিন্তু আমার কথা আপনাকে পুরোটা আজ শুনতেই হবে। আপনি ঈদের দিনেও একটা ফালতু কথা বলেছেন, আমি কিছুই বলিনি।

রাগ হতে আজ তিনি প্রথম দেখলেন। থতমত খেয়ে বললেন, আচ্ছা বল, কি বলবা?

-হুম। যেটা বলছিলাম আর কি। তো আপনার বাবাকে এভাবে ঘুমন্ত অবস্থায় কুপিয়ে মেরে ফেলার পর আমি সবার সামনে দিয়ে আপনার বাসা থেকে বের হয়ে আসলাম। সবাই জানল, কে মেরেছে। কিন্তু কারোরই কিছু করার ক্ষমতা নেই, সাহস নেই। এভাবে এক দুই দিন পার হওয়ার পর কোন একটি উপলক্ষে আমি আমার বাসায় খাওয়া দাওয়া আয়োজন করলাম এবং সেখানে সপরিবারে আপনাকেও দাওয়াত দিলাম।
তো, আপনি কি আসবেন?

আবার রাগ হয়ে গেলেন।
-মিয়া ! তোমাকে তখন সামনে পাইলে দুই হাত দিয়া ধরে মাঝখান থেকে ফেড়ে ফেলতাম। তুমি বলতেস দাওয়াত খাওয়ার কথা। বল কেমনে এ সমস্ত উদ্ভট কথাবার্তা।

মুচকি হেসে পকেট থেকে মোবাইলটা বের করলাম। গাযযার কয়েকটি ছবি তাকে দেখালাম।

-এইযে ছিন্নভিন্ন দেহটা দেখছেন, এটা কারো বাবা,আমার আপনার মুসলিম ভাই। আর এইযে দুভাগ হয়ে যাওয়া মেয়েটিকে দেখছেন, এটা কারো মেয়ে, আমার আপনার মুসলিম বোন। কারা মেরেছে জানেন? আপনার হাতে পেপসিটা যারা তৈরি করেছে, তারা।

ভাইয়া ! আমি পেপসি এ উদ্দেশ্যে খাওয়া ছাড়িনি যে, এতে করে আমি ইহুদি বা ইসরায়েলের অর্থনীতিতে ধস নামাতে পারব। আমি লাভ ক্ষতির হিসেব করে খাওয়া ছাড়িনি। আমিতো এ জন্য খাবনা,কেননা আমার মুখে উঠে না। আমার ভাইয়ের হত্যাকারীর রক্তাক্ত হাতে বানানো প্রডাক্ট আমার মুখে উঠে না, তাই আমি খাব না। আল্লাহর কসম! এ পেপসি দেখলেই আমার মনে পড়ে, এ ছবিগুলোর কথা। আমি খেতে পারিনা ভাইয়া। আপনার কাছে বাড়াবাড়ি মনে হতে পারে, কিন্তু এটাই বাস্তব।
আমি জানি না, এভাবে আমি কয়টা প্রডাক্ট বর্জন করতে পারব। কিন্তু আমি চেষ্টা করে যাব, যতটুকু সম্ভব।

একটানে এত গুলো কথা বলে নিচের দিকে তাকিয়ে একটু নিশ্বাস নিচ্ছিলাম। হঠাৎ একটি আওয়াজে চমকে উঠলাম। আল্লাহ তাআলা আমার এই ভাইটিকে কবুল করেন, হাতে থাকা পেপসির বোতল সামান্য পেপসি সহই ছুড়ে মারলেন। সবসময় তুমি করে বলতেন, এখন তুই করে বলে উঠলেন,

-ভাইরে! আমি আগে কখনও এই এঙ্গেল থেকে চিন্তা করিনি। আমি সরি, না বুঝে তোকে অনেক কথা বলে ফেলেছি। আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলছি, যতদিন বেঁচে থাকবো, ইনশাআল্লাহ আর কোন দিন পেপসি ছুঁয়েও দেখব না.........

-- Rizwanul Kabir

No comments:

Post a Comment