নসীম হিজাযীর অমূল্য উপন্যাসসমূহের নাম ও বিষয়বস্তু

নসীম হিজাযী: উপমহাদেশের ওয়াল্টার স্কট

নসীম হিজাযী-- নিঃসন্দেহে উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকদের মধ্যে একজন এবং উর্দু ভাষার সাহিত্যিক দের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কথাশিল্পী। ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনায় ও তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রশ্নাতীত। কবিতা নির্ভর উর্দু সাহিত্যে গদ্যশিল্পি হিসেবেই তাকেই প্রধান বিবেচনা করা যায়। তার সমসাময়িক সাদত হাসান মান্টো,ইসমত চুঘতাই, কুররাতুল আইন হায়দার বা ইবনে শাফি উর্দুভাষায় গদ্য লেখক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করলেও তাদের প্রধান সাফল্য ছিল ছোট গল্পে। উপন্যাস রচয়িতা বিশেষ করে ঐতিহাসিক উপন্যাস রচয়িতা হিসেবে তার স্থান সবার থেকে উপরে। আদর্শগতভাবেও নসীম হিজাযী তার সমসাময়িক সাহিত্যিকদের অনেক বিপরীত। ভারত বিভাগের সময় নিজের জন্মভূমি ছেড়ে আসতে বাধ্য হওয়া নসীম হিজাযী ছিলেন ইসলামের একজন একনিষ্ঠ অনুসারি ও ইসলামের ইতিহাসের একজন গবেষক। অন্যদিকে তার রচিত ঐতিহাসিক উপন্যাস গুলির ঐতিহাসিক সত্যতা ও প্রশ্নাতিত। ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে রোমান্টিক কাহিনী সংযোজন করে একই সঙ্গে সুখপাঠ্য উপন্যাস রচনায় তাকে স্যার ওয়াল্টার স্কট এর সমকক্ষ বিবেচনা করা হয়। অন্যদিকে স্যার ওয়াল্টার স্কটের তুলনায় তার রচনায় ঐতিহাসিক তথ্যের কোন ভুল বা মিথ্যার উপস্থিতি নাই। বাংলা ভাষায় ঐতিহাসিক উপন্যাসের প্রথম লেখক বঙ্কিমচন্দ্র যে দোষে খুবই দুষ্ট। বঙ্কিম নিজের আদর্শ প্রচারে ঐতিহাসিক তথ্যের বিকৃতি ঘটাতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি। সে খানে নসীম হিজাযী তার ঐতিহাসিক সচেতনতা ও নির্ভুলতার জন্য বিশেষ ভাবে আলোচিত।

নসীম হিজাযীর জন্ম অবিভক্ত ভারতের পাঞ্জাব এর গুরুদাসপুর জিলার সুজ্জানপুর গ্রামে ১৯১৪ সালে। তিনি সচ্ছল ও শিক্ষিত পরিবারের সন্তান ছিলেন। তার প্রকৃত নাম মুহাম্মদ শরিফ। যতটুক জানা যায় তিনি লাহোরে বি,এ পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। নিজেদের জমিজমা দেখাশুনা করাই ছিল তার জীবিকা। বিভাগপুর্ব সময়ে অল্প লেখালেখিও করতেন। ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগষ্ট পাকিস্তান যখন স্বাধীন হয় তখন গুরুদাসপুর জিলা মুসলিম প্রধান হিসেবে পাকিস্তানে অন্তর্ভূক্ত হয়। কিন্তু ১৭ই আগষ্ট রেডক্লিফ কমিশনের রোয়েদাদ ঘোষিত হয় এবং সকল যুক্তিকে পাশ কাটিয়ে গুরুদাসপুর জেলাকে ভারতে অর্ন্তভুক্ত করা হয়। এ অবস্থায় নসীম হিজাযী হিজরত করে পাকিস্তানে চলে আসতে বাধ্য হন। তার জীবনের এই ঘটনা গুলি তিনি পরবর্তিতে উপন্যাসের মাধ্যমে উপস্থাপন করেন। পাকিস্তান আসার পর তিনি সাহিত্যিক এর জীবন যে বেছে নেন। নিভৃতচারী এই উপন্যাসিক ১৯৯৬ সালে ইন্তেকাল করেন। ঐতিহাসিক উপন্যাস ছাড়াও তিনি কয়েকটি ব্যাঙ্গ রচনাও লিখেছেন। তার বেশিরভাগ উপন্যাস এরই মধ্যে বাংলা অনুবাদ হয়েছে। নসীম হিজাযী উপমহাদেশ,স্পেন ও আরবের ইতিহাস নিয়ে উপন্যাস রচনা করেছেন।

তার রচিত উপন্যাসগুলোর বিবরণ:

স্পেন সংক্রান্ত

১.ইউসুফ বিন তাশফিন: বাংলায় একই নামে অনুদিত। স্পেনে মরক্কোর সুলতান ইউসুফ বিন তাশফিন এর অভিযান এর কথা এই উপন্যাসের বিষয়।
২. শাহিন: "সিমান্ত ঈগল" নামে অনুদিত। স্পেন এর পতনের সময় সিয়েরা নিবেদা অঞ্চলে বদর বিন মুগিরার সংগ্রামের কথা এই উপন্যাসের বিষয়। বদর বিন মুগিরা স্পেনের ঈগল নামে খ্যাত ছিলেন।
৩. আধেঁরি রাত কি মুসাফির: "আঁধার রাতের মুসাফির" নামে অনুদিত। এই উপন্যাসের বিষয় গ্রানাডাকে রক্ষার শেষ চেষ্টা এবং শেষ পর্যন্ত কুখ্যাত এপ্রিল ফুল এর মাধ্যমে গ্রানাডার পতন।
৪. কলিসা আওর আগ (গির্জা ও আগুন): "শেষ রাতের মুসাফির" ও "শেষ বিকালের কান্না" নামে অনুদিত। এটি আধেঁরি রাত কি মুসাফির এর সিক্যুয়েল। গ্রানাডার পতনের পরবর্তি স্পেন এর মুসলিমদের অবস্থা ও কুখ্যাত ষ্পেনিশ ইনকুইজিশন এর অত্যাচার এর ইতিহাস এই উপন্যাসে আলোচিত হয়েছে।

ইসলাম পুর্ব ও প্রাথমিক যুগ

৫.কায়সার ও কিসরা: ইসলাম পুর্ব আরবের ইতিহাস ও গোত্রীয় দ্বন্দ্ব এবং তৎকালিন দুই পরাশক্তি রোম ও ইরানের যুদ্ধ এই উপন্যাসের কাহিনী। ইসলামের আবির্ভাব ও বিজয় এর কাহিনী এই উপন্যাসের প্রধান বিষয়।
৬. কাফেলায়ে হেজাজ: "হেজাজের কাফেলা' নামে অনূদিত। ইসলাম পুর্ব ইরানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে কাদিসিয়ার যুদ্ধের পরবর্তি অবস্থা এই উপন্যাসের বিষয়।
৭. দাস্তান ই মুজাহিদ: "মরণজয়ী" নামে অনুদিত। এই উপন্যাসে খলিফ ওয়ালিদ এর সময় মুহাম্মদ বিন কাসিম, কুতায়বা বিন মুসলিম, মুসা বিন নুসাইর ও তারিক বিন যিয়াদ এর কাহিনী বর্নিত হয়েছে।
৮.মুহাম্মদ বিন কাসিম: শ্রীলংকার সাথে আরবদের বানিজ্যিক সম্পর্ক, ও মুহাম্মদ বিন কাসিমের জীবন ও সিন্ধু বিজয়ের কাহিনী এই উপন্যাসের বিষয়।

আব্বাসিয় খিলাফতের পতন:

৯.আখেরি চাটান: "শেষ প্রান্তর" নামে অনুদিত। চেঙ্গিস খান ও হালাকু খান কতৃক মুসলিম জাহানের উপর হামলা ও ধ্বংসের ইতিহাস এই উপন্যাসের বিষয়।
১০.আখেরি মায়ারকাঃ "চুড়ান্ত লড়াই' নামে অনূদিত।

উপমহাদেশ: 
১১.ইনসান আওর দেওতা: "আলোর কুসুম" ও "মানুষ ও দেবতা" নামে অনুদিত। ইসলাম পুর্ব ভারতিয় সমাজের অবস্থা বিশেষ করে বর্নাশ্রম ও অস্পৃশ্যতা এই উপন্যাসের বিষয়।
১২. মুয়াযযম আলি: "খুন রাঙ্গা পথ" নামে অনুদিত। এই উপন্যাসে নবাব আলিবর্দি খান ও নবাব সিরাজদেীলার পতন। পানিপথের তৃত্বিয় যুদ্ধ এবং ইংরেজদের উপমহাদেশের দখলের ইতিহাস বর্নিত হয়েছে।
১৩.আওর তলোয়ার টুট গেয়ি: "ভেঙ্গে গেলো তলোয়ার" নামে অনূদিত। এটি "মুযাযযম আলি" এর সিক্যুয়েল। এই উপন্যাসে মহিশুরের ব্যাঘ্র টিপু সুলতানের সংগ্রামের কাহিনী বর্নিত হয়েছে। যাকে পরাজিত করে ইংরেজরা উপমহাদেশের পূর্ন নিয়ন্ত্রন লাভ করে।
১৪.খাক আওর খুন: "ভারত যখন ভাঙ্গলো" নামে প্রকাশিত।এই উপন্যাসে ভারত বিভাগের ইতিহাস এবং বিভাগের সময় হিন্দু ও শিখ কতৃক মুসলিমদের উপর হামলার কাহিনী বর্নিত হয়েছে। পাঞ্জাবের গুরুদাসপুর জিলা যা প্রথমে ভোটের ভিত্তিতে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হলেও রেডক্লিফ এর ষড়যন্ত্রে ১৭ই আগষ্ট ভারত ভুক্ত হয় তার ইতিহাস এবং কাশ্মির যুদ্ধ এই উপন্যাসের বিষয়বস্তু। এই উপন্যাস অবলম্বনে একই নামে একটি ছায়াছবি নির্মিত হয়েছে যা উর্দু চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে হিট বলে বিবেচিত।

১৫. পরদেশি দিরখাত(পরদেশি গাছ): "অপরাজিত" নামে অনূদিত। বিভাগ পুর্ব উপমহাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা এই উপন্যাসের বিষয় বস্তু। এই উপন্যাস এবং এর সিক্যুয়েল "গুম শুদা কাফিলা" নসীম হিজাযীর নিজের জীবনের কাহিনী নিয়ে লিখা।
১৬. গুমশুদা কাফিলা(হারানো কাফিলা): "রক্ত নদী পেরিয়ে" নামে অনুদিত। ভারত বিভাগ এর সময় ঘটে যাওয়া দাঙ্গা এবং বিভাগ পরবর্তি ইতিহাস এই উপন্যাসের বিষয়।

এছাড়াও নসীম হিজাযী কয়েকটি রম্য ব্যাঙ্গ রচনা ও লিখেছেন যেগুলি হচ্ছেঃ

১৭. সাকফাত কি তালাশ (সংস্কৃতিক সন্ধান)।
১৮.পুরস কি হাতি( পুরুও হাতি)।
১৯,সও সাল বাদ(শতবর্ষ পরে)।
২০.সফেদ জাযিরা(সাদা দ্বীপ) : এই রম্য উপন্যাস টিতে পাকিস্তানের আইয়ুব খানের শাসন এর সময়কালকে ব্যাঙ্গ করা হয়েছে।

1 comment:

  1. জাযাক আল্লাহ খাইরান ভাই :)

    ReplyDelete